স্পর্শের নাম ভালবাসা

Mar 26, 2019
289 Views

ভেজা চুল, হাতের চুড়ি, চোখের নিচে পড়ে যাওয়া কাজল, নির্দিষ্ট করে দেওয়া বামহাতের আংটি, অগোছালো বিছানা, প্রতিদিন মনে করিয়ে দেয় আমি বিবাহিত। এটাই বিবাহোত্তর প্রতিদিন স্বাভাবিকতা। কিন্তু আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ভাবতে গেলে সব অস্বাভাবিকতা লাগে৷ কষ্ট লাগে, বেঁধে দেওয়া নিয়ম সারাজীবন চালাতে পারব কী না এই নিয়ে। সারাদিন আমি ভালই থাকি, কিন্তু রাত হলেই আমি অশান্ত হয়ে উঠি। অন্ধকারের কালোত্বই আমার ভয়।

বাহানা মাঝে মাঝে অন্ধকার থেকে মুক্তি দেয়, কিন্তু বেশিরভাগ সময় মেনে নিতে হয় বিছানার চাদর চেপে ধরে। অসহায়ের মত লাগে সবকিছু, প্রচন্ড চিৎকার দিয়ে বলতে মন চায়, “স্পর্শে যার অনীহা, শিহরণ তাকে বিভীষিকা দেখায়।” পরক্ষণে মনে পড়ে আমি যে সম্পর্কের সাইনে বাঁধা।

তবুও জানি “সাদ” (আমার হাজবেন্ড) জোর করা ছেলেদের মত না, আমি না চাইলে সে তার থেকে আমাকে আলাদাই রাখবে। কিন্তু ভয়টা যে তার প্রশ্নে!

যদি সে আমার ভয়ের কারণ জানতে চায়? সে যে “স্পর্শের নাম দিয়েছে ভালবাসা।” নীরবতা আমার মধ্য, সাদকে আমি ধোঁকা দিয়েছি, মিথ্যা প্রাচুর্য সাথে নিয়ে, তার সাথে সম্পর্কের সুতায় নিজের নাম জুড়ে দিয়েছি। এমন না যে সত্য বলতে চাইনি, কিন্তু সত্য যে আমার পরিবারকে অসম্মানের দাঁড়িপাল্লায় দাঁড় করিয়ে দিবে৷ শরীরের লোম শিউরে দাঁড় করিয়ে দেবার সত্যটা কী সাদ সহজভাবে নিতে পারবে!

২০১১ সালে ঘটে যাওয়া আমার পরিহাস কি সাদ তার মধ্য ধারণ করতে পারবে? এখন যতটুকু ভালবেসে আগলে রাখে, সত্যটা জানার পর সম্মানটাই দিবে কী না? এটাই আমার সন্দেহ।

২০১১ সাল মাত্র কলেজে ভর্তি হয়েছি। চঞ্চলতার উদ্যম তখনও আমার মধ্যে। পড়ালেখা আর বন্ধুত্ব ব্যতীত জীবনে কিছু থাকতে পারে, এটাই আমার জানার বাহিরে৷ প্রতিদিনের মত চলতে থাকা দিনটার একদিন পরিবর্তন হয়। মনে আছে, কলেজের ক্লাস আর কোচিং এর পরীক্ষা শেষ করে বাসায় ফিরছিলাম সন্ধ্যার সময়। অটো থেকে নেমে বাসার রাস্তায় হাঁটছি। যখনি নিজের বাসার গলিতে ঢুকতে যাব! ঠিক সেই সময় কী জানি কী হল? অনুভব করলাম কারা যেন আমার মুখ চেপে ধরেছে৷ আওয়াজ করার চেষ্টা করলাম কিন্তু কেউ মনে হয় শুনতে পেলনা।

লোকগুলোর চেপে ধরার স্পর্শ কী যে বিচ্ছিরি তা ভাষায় বলে বুঝাবার না। মনে হয়, আমাকে এলাকার পিছের মাঠে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।স্পষ্ট মনে আছে, তারা তিনজন ছিল। তাদের স্পর্শ যেন ব্লেডের মত ধারালো ছিল? আমার শরীরের যেখানে হাত পড়ছিল, সেখান থেকেই রক্তক্ষরণ হচ্ছিল। মানুষ মানুষকে এত তীব্রভাবে যন্ত্রণা দিয়ে স্পর্শ করতে পারে, এটা সেদিন জেনেছিলাম। যন্ত্রণার চিৎকার সেদিন অন্ধকারের কালোত্বে ঢেকে গিয়েছিল। রক্ষা হয়ে ছিলনা আমার। তবে তীব্র আঁচরের, রক্তক্ষরণের যন্ত্রণা আমার জ্ঞান বেশিক্ষণ রাখেনি। হয়তো শরীরটাও সেদিন অসহ্য হয়ে গিয়েছিল। মনে নেই, সেদিন রাত কতক্ষণে শেষ হয়েছিল আর কতটাই বড় হয়েছিল আমার জন্য।

যখন জ্ঞান ফিরে, তখন দেখি মাথার পাশে মা৷ হাতে স্যালাইনেরর সূচ, শরীরের জায়গায় জায়গায় ব্যান্ডেজ। বুঝলাম আমি হসপিটালে৷ কিছুক্ষণ পর ডাক্তার আসলেন, তার ভাষ্যতে বুঝলাম, তিনদিনপর আমার জ্ঞান ফিরেছে। বাবা আসল আমাকে দেখতে, কিন্তু দেখতে এসে আমার হাত ধরে অনেক কাঁদল, আর কী যেন বিড়বিড় করে বলছিল। মা-বাবা কেউ কোন প্রশ্ন করেনি আমায়।

একমাস তের দিন লাগল আমার উঠে দাঁড়াতে৷ হসপিটাল থেকে ডিসচার্জ হয়ে বাসায় আসলাম? কিন্তু এলাকার মানুষ কীভাবে যেন আমার দিকে তাকিয়ে থাকত! কী যেন একটা কথা বলত! আমি শুধু তাদের দিকে তাকিয়ে ভাবতাম যে সমাজ মানুষের বানানো সেখানে মানুষের সম্মানটাই কত ছোট?

চঞ্চলতা সে রাতের পর থেকে একদমই কমে গিয়েছিল। নিজের ঘরেই থাকতাম, মানুষ দেখলে আমি ভয়ে রুমে চলে যেতাম। বাবার নির্দেশ ছিল, আমার নজরে যেন ছেলে না পড়ে৷ কারণ বাবার বিশ্বাস, এটাই আমাকে বিব্রত করবে। কয়দিনপর বাবা আমার কলেজ থেকে টি.সি নিয়ে আসলেন। ভাবলাম পড়ালেখা বুঝি এখানেই শেষ। জীবন গড়ার স্বপ্নবুঝি আর দেখা হবে না।

মূল্যহীন জীবন ভাবাত, বাবা আমাকে কোন ভুলের সাজা দিচ্ছেন! দেখতে দেখতে দুইমাস পার হল, বাবার চাকরি বদলালেন। নতুন শহরে আমাকে নতুন কলেজে ভর্তি করলেন। সেদিন অনেক খুশি হয়েছিলাম। বাবার প্রতি অনেক সম্মানবোধ থেকে গেল। কিন্তু মানুষের ভিড় আমাকে ভীত করত। বাবা এজন্য খুবভাবে আমার সাথে থাকতেন। সব জায়গায় আমাকে নিয়ে যেতেন।

ঘটনার চার বছর পার হল, বাবা ভাবলেন আমি অতীত ভুলে গেছি৷ বাবা চাইল, আমি জীবনটা কারও সাথে এগিয়ে নিয়ে যাই৷ সাদের হাতে হাত দিয়ে মেয়ের বিয়ের স্বপ্ন পূরণ করলেন বাবা৷ কিন্তু অন্ধকারের কালোত্বর ভয় আজও আমাকে ভীত করে, এটা বাবা আর সাদ কাউকে বলা হয়নি না আমার, হয়তো হবেও না। এই সত্যটা কাউকে ভাল থাকতে দিবে না।

Author
Sanzida Islam Nidhi

Sanzida Islam Nidhi

Sanzida Islam Nidhi

  • leave a comment

    Your email address will not be published. Required fields are marked *