ক্ষণ…

May 29, 2018
458 Views

ক্ষণ…

আমি মৃদু হেসে নিলু’র দিকে চেয়ে আছি। তার নাকের ডগা এবং কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমছে। সেই ঘাম সে শাড়ির আঁচলে মুছছে আর চোখ বড় বড় করে কাব্যকে দেখছে। কণ্ঠে রাজ্যের বিস্ময় নিয়ে এবার আমাকে উদ্দেশ্য করে বলল, “ শুনলে ! শুনলেতো তোমার ছেলে এটা কি বলছে !”আমি মুখ কাচুমাচু করে রাখলাম। ভাবখানা এমন যেন গভীর চিন্তায় আছি। কাব্য গাল ফুলিয়ে বুর বুর করে থুথু ফেলছে। আমাদের দুই বছর বয়সী একমাত্র পুত্র সন্তান নতুন কথা বলতে শিখছে। “মা” কে সে বলে “মামাম” আর বাবাকে বলে “বাব্বান”।
তবে আজ সকালেই সে সম্পূর্ণ একটি বাক্য বলেছে। সেই বাক্য শুনে নিলু’র চোখ কপালে উঠে গেছে। সে রীতিমতো কাব্যকে জেরা শুরু করেছে। কাব্য’র অপরাধ সে গাল নাক ফুলিয়ে মাকে বলেছে, “ পাতু দিসে… ।““ পাতু দিসে !! এইটুকুন ছেলে কোথায় শিখলো এই কথা !! যে ছেলে ঠিক মতো “মা” ই ডাকতে পারেনা সে কিনা এই কথা বলছে!! নিশ্চয় রেশমা শিখিয়েছে!! নাহলে আর কে বলবে এমন কথা !!??”রেশমা নামের ছোট মেয়েটা নিলুকে ঘরের কাজে সহযোগিতা করে। আমি এবার হালকা সুরে বল্লাম, “ইয়ে, বলছিলাম… না জেনে… “আমার মুখের কথা কেড়ে নেয় নিলু, “না জেনে মানে ?! আমি আর রেশমা ছাড়া কে-ই বা থাকে কাব্য’র পাশে! তুমিতো সারাক্ষণ অফিস নিয়েই আছ!“
আমি আর কথা না বাড়িয়ে চুপ করে খবরের কাগজে মনোযোগ দিলাম। নিলু রেশমা কে ডেকে এক চোট শুনিয়ে দিলো এর মধ্যে । রেশমা বকা খেয়ে দুঃখ পেলো বলে মনে হলো না। সে জানে তার নিলু আপার মুখেই যা অন্তরটা ফকফকা সাদা। এমন বকুনি সে প্রায় ই খায়। তবে এটা ঠিক দুপুরে নিলু আপা গোসলে গেলে কাব্য তার কাছেই থাকে। সেদিনও ছিল। এরমদ্ধে কাব্য বাবা ছোট্ট করে বায়ু বিসর্জন দিতেই রেশমা হেসে হেসে কয়েকবার বলেছিল, “ হায় হায় কাব্য আব্বাজান তো পাদু দিছে…।”এই কথা যে এতটুকন পুচকি মনে রাখবে সেকি আর জানতো ! জানলে বলতো না।

দুপুরে খাবার সময় মুরগি তরকারি থেকে রেশমা কে একটা রান দেয়া হয়েছে। রান তার খুবই প্রিয়। আমি হাসি চেপে রেখে চুপচাপ খেয়ে উঠি। মহারানী দেখলে খবর আছে। তবে এটা বুঝতে কষ্ট হয়না। রেশমা কে ওভাবে বকা দেয়ার কারনে নিলু’র মনটা কিঞ্চিৎ খারাপ। সেই কারনেই রান দেয়ার মাধ্যমে সেই মন খারাপ ভাব কাটানোর ব্যবস্থা করেছে সে।মনে মনে হাসি আমি … আমার পাগলী বউটা…

দিন যত যাচ্ছে কাব্য টা ততোই পাজী হচ্ছে। এইতো বয়স আড়াই হতেই ঘটিয়ে বসলো এক অঘটন। একদিন বিড়ালের মতো খাটের নিচ থেকে জুতার কালি বের করে সারা শরীর এবং মুখে পরম আনন্দে মেখে নিলো। তাকে দেখতে ঠিক কালো বিড়াল এর মতো লাগছিলো। একসময় দেখা গেলো নিলু ডলে ডলে তাকে গোসল করিয়ে দিচ্ছে আর কালো বিড়াল কাব্য মনের আনন্দে হাত তালি দিচ্ছে।

এরপরের ঘটনা আরও ভয়ঙ্কর ! এক দুপুরের কথা। রেশমা ঘুমিয়ে। নিলু সম্ভবত বাথরুমে ছিল। কাব্য ঘুম থেকে জেগে উঠে সুসু করলো। তাতেই সে ক্ষান্ত নয়, সেই সুসু’র কিছুটা মুখেও পুরে নিলো। তারপর সেই স্বাদ ভালো না লাগায় গলা ফাটিয়ে কান্নাকাটি শুরু করে দিলো। নিলু দৌড়ে বাথরুম থেকে বেরিয়েই কাব্যের এই অবস্থা দেখে বিকট চিৎকার দিলো। সেই চিৎকার এতোই জোরালো ছিল যে রেশমা ধড়ফড় করে জেগে ছুটে আসে। এরপরই আমার অফিস এ আসতে থাকে ফোনের পর ফোন… “ এই শুনছো …! কাব্য তো সুসু করে সেটা গিলে ফেলেছে !!! এখন কি হবে….??!! আমি এক্ষুনি ওকে ফার্মেসীতে নিয়ে যাচ্ছি… । এই তুমি কখন আসবে…!!??”পাগলী বউ আমার… ছোট বেলায় অমন সুসু কতো বাচ্চাই খায়। কিন্তু এ কথা বুঝাবে কে তাকে। আর বুঝিয়েই বা কি হবে ? সন্তানের প্রতি মা এর এই পবিত্র ভালোবাসা কোন যুক্তি মানেনা। তাদের মধ্যে সন্তানকে নিয়ে চিন্তা, উদ্বিগ্নতা থাকবেই। সেটা যুক্তিসঙ্গত হোক বা না হোক।এভাবেই মা বাবা’র আদর, ভালোবাসা এবং রেশমা’র স্নেহ নিয়ে বেড়ে উঠতে থাকে কাব্য। আমার দেয়াল ঘেরা একতলা পুরো বাড়িটা জুড়ে ফুলের বাগান। কতোরকম ফুল যে আছে সেখানে। তবে আমার প্রিয় ফুল দুটো আমার অন্তরের বাগানেই ফুটে আছে, সারাক্ষণ সৌরভ ছড়াচ্ছে। নিলু আর কাব্য…

১৩ বছর পরের কথা। রেশমা’র বিয়ের বয়স হতেই দেখে শুনে তাকে একটা বিয়ে দিয়ে দিলাম আমরা। এটা নৈতিক দায়িত্ব বটে। তবে এও সত্যি, রক্তের কেউ না হয়েও সেদিন মেয়েটা আমাদের কাঁদিয়েছিল। বালিশের কোনে নিলু’র ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্না আমায় মোটেই অবাক করেনি। আসলেইতো রেশমা তার জীবনের অর্ধেকটা সময় আমাদের সাথেই কাঁটালো। মায়া তো লাগবেই। আহারে মায়া……

এরপর কেটে গেলো আরও এক যুগ……

……আজ হঠাৎ মনে হচ্ছে সময় টা বড্ড তাড়াহুড়া করলো বুঝি। আমার পাগলী বউটা আমায় ছেড়ে চলে গেলো… এমন কোথাও গেলো যেখানে যাবার জন্য যাত্রী হয়ে আমিও দিন গুনছি। কাব্য চলে গেলো দেশের বাইরে উচ্চ শিক্ষার জন্য। এখন এই পুরনো বাড়িটায় আমিই পড়ে আছি পু্রনো আসবাব এর মতন। পাগলী বউটা নেই , কালো বেড়াল ছেলেটা নেই… বোকা রেশমাটাও নেই…
…শুধু আছে পাঁচিল আঁকড়ে ধরা বুনোলতা। আছে বাগানের কোনে অবহেলায় পড়ে থাকা মরচে ধরা পুরনো সেই দোলনা। আছে সারি সারি গাঁদা ফুলের চারা, নিলু’র হাতে লাগানো সেই চাঁপা ফুলের গাছটা। আজও বিকেলের মিষ্টি রোদ আমার বাগানে আলো ছড়ায়। ছোট্ট চড়ুই এর দল এলো মেলো উড়ে বেড়ায়। আজো গোলাপের কাঁটায় আমার হাতে রক্তের বিন্দু জমে, কিন্তু কেউ পাগলের মতো ছুটে এসে বলেনা, “ ইশ ! কি করে করলে ! “আজও ভোরের শুভ্র আলো আমার ঘুম ভাঙায়। শিশিরে ভেজা কচি ঘাস হাতছানি দেয়। কিন্তু কেউ আদুরে কণ্ঠে বলেনা, “ চল না একটু হেটে আসি…।” আজ খালি পড়ে আছে এ বাড়ির করিডোর…। ওখানে থপথপ পায়ে কেউ”বাব্বান” বলে দৌড়ে আসেনা। পড়ে গিয়ে ব্যাথা পেয়ে কেঁদে উঠেনা। আজ উদ্বিগ্ন কণ্ঠে কেউ বলেনা, “ এই শুনছো… কাব্যটা যে পড়ে গেলো…। “ আজ শুধু ফিরে আসে দীর্ঘশ্বাসের প্রতিধ্বনি…হাহাকার… শুধু হাহাকার… ভুল কিনা জানিনা, প্রায়ই যেন শূন্য ঘরের দেয়াল ছুঁয়ে নিলু’র কণ্ঠ ভেসে আসে…। রান্না ঘরে শুনতে পাই তার আর রেশমা’র হইচই।সবকিছুই আগের মতো আছে… শুধু আমার সৌরভ ছড়ানো ফুল গুলো চোখের আড়াল হয়ে গেছে…আর আমি, ফুল পাতাবিহীন শুকনো ডাল… অপেক্ষার প্রহর গুনছি… এই শূন্য ছেড়ে অন্য শূন্যতার… ।

(সমাপ্ত)

ক্ষণ… চলে যাচ্ছে… কেউ অনুধাবন করছে, কেউ বা করছে না। যা আছে, যে আছে, তাকে যথাযথ ভাবে মূল্যায়ন করুন। ভালবাসুন। উড়ন্ত মেঘের মতো আশে পাশের দৃশ্য পট বদলে যাবে একদিন হুট করেই।

মূল লেখাঃ তানিয়া সুলতানা (রোম, ইতালি।)

Author
Bangladesh Information

Bangladesh Information

"Bangladesh Information" is working on the goal of promoting Bangladesh in the world. Let's fulfill Bangladesh Information's goal, you can also raise the country with the help of the Bangladesh Information.

  • leave a comment

    Your email address will not be published. Required fields are marked *