নাইটকুইন

May 28, 2018
309 Views

অনেকদিন আগের কথা। নবগঙ্গা নদীর তীরে ছিল এক ধনীলোকের বাগানবাড়ি। সেই বাগানবাড়িতে বিভিন্ন ধরনের ফুলগাছ ছিল। শত শত টবে ফুলের চারা লাগানো হয়েছিল। ধনী ব্যক্তি প্রতিদিন একবার করে ফুলবাগানে ঘুরতেন। ফুলবাগান দেখাশোনার জন্য একজন মালী রাখা হয়েছিল।

ঐ বাগানে যতগুলো ফুলের টব ছিল, প্রায় সব টবের ফুলগাছেই ফুল ধরত, শুধু একটা টবে ফুল ধরত না। ফুল না ধরার কারণে ধনী ব্যক্তিটি মালীকে বলেছিলেন, ফুল না ধরা টবটি এখনই যেন বাগান থেকে সরিয়ে নদীতে ফেলে দেওয়া হয়।

মালী টবটি নদীতে না ফেলে বাগানের এক কোণে লুকিয়ে রাখে। পরদিন ধনী ব্যক্তি বাগানে ঘুরছিলেন। হঠাৎ তাঁর চোখে পড়ল ফুল না ধরা টবটি। তিনি দেখলেন, ঐ টবে যে ফুলগাছটি রয়েছে তাতে একটু আগেই পানি দেওয়া হয়েছে। তিনি তৎক্ষণাৎ মালীকে তলব করলেন। মালী তাঁর ডাক শুনে ছুটে এলো। তিনি মালীকে বললেন, এই টবটি না সরিয়ে রেখে দিয়েছ কেন?

মালী বলল, ধৈর্য ধরে এই ফুলগাছটির দেখাশোনা করলে এতে একদিন ফুল ফুটবেই।

মালীর কথা শুনে ধনী ব্যক্তির রাগ হলো। তিনি বললেন, আমার আদেশ পালন না করে উল্টো আমাকেই উপদেশ দেওয়া হচ্ছে। তোমাকে এখনই চাকরি থেকে বহিষ্কার করা হলো।

মালী দরিদ্র হলেও তার ভিতরে প্রচণ্ড আত্মসম্মানবোধ ছিল। চাকরি বাঁচানোর জন্য সে ধনী ব্যক্তির কাছে আর কাকুতি-মিনতি করেনি। আসার সময় শুধু ধনীকে বলেছিল, যে ফুলগাছটির জন্য চাকরি হারালাম সেটি আমি সাথে করে নিয়ে যাচ্ছি।

মালীর বাড়ি ছিল ধনীর বাগানবাড়ির খুব কাছাকাছি। ঐ বাগানবাড়ি থেকে মালীর কুঁড়েঘর দেখা যেত। চাকরি হারিয়ে মালী নবগঙ্গা নদীতে নৌকা চালিয়ে জীবিকানির্বাহ করত। প্রতিদিন সকালে নদীতে নৌকা নিয়ে বের হবার আগে সে ফুলগাছটিতে পানি দিত, আবার ফিরে এসে ফুলগাছের দেখাশোনা করত। মালীর এই কাজ দেখে ধনী ব্যক্তি দূর থেকে মিটিমিটি হাসত।

এভাবে মাসের পর মাস, বছরের পর বছর কেটে যায়, সেই ফুলগাছে ফুল আর ধরে না। কিন্তু মালী কখনো অধৈর্য হতো না। সে শুধু এটা ভেবেই খুশি হতো যে, শত দুঃখ-কষ্ট-দরিদ্রতার মাঝেও একটা গাছকে তো অন্ততঃ বাঁচিয়ে রাখতে পেরেছি।

অবশেষে ছয় বছর পর আসে সেই শুভক্ষণ। সেদিন সন্ধ্যার কিছুসময় পরেই ঐ ফুলগাছে একটি ফুল ফুটতে থাকে। ধীরে ধীরে সেই ফুলের সৌন্দর্য এমনভাবেই বিকশিত হতে থাকে যে, নদীর আশপাশে বসবাসরত দু-চারজন লোক ফুলটি ফুটতে দেখেই অন্যদেরকে জানায়। রাত দশটা-এগারোটার মধ্যে ফুলটি পূর্ণভাবে বিকশিত হয়। ফুলটির নাম ছিল নাইট কুইন। পৃথিবীতে দুর্লভ প্রজাতির ফুলের মধ্যে নাইট কুইন অন্যতম। নাইট কুইন ফুল দেখার জন্য ঐ রাতে হাজার হাজার মানুষের সমাগম ঘটে। নদীর তীর কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায় ক্ষণজন্মা-মনোলোভা ফুলটিকে একটিবার দেখার আশায়। ফুলটির পিছনের কারিগর সেই মালীকে দেখা যায় ফুলটির দিকে অপলক নয়নে চেয়ে থাকতে, তার এত বছরের সাধনা যে আজ স্বার্থক হয়েছে।

পরদিন সেই ধনী ব্যক্তিটি মালীর কুঁড়েঘরে এসেছিল। সে প্রচুর টাকার বিনিময়ে মালীর কাছ থেকে নাইটকুইন গাছটি কিনে নিতে চেয়েছিল। কিন্তু মালী বিক্রি করতে রাজি হয়নি। মালী শুধু বলেছিল, “এ গাছে গত রাতে যে ফুল ফুটেছিল তার স্থায়িত্ব ছিল মাত্র কয়েক ঘন্টা। আবার ফুল ফুটতে যতদিন অপেক্ষা করতে হবে, ততদিন অপেক্ষা করার মতো ধৈর্য আপনার মতো ধনীদের নেই। কোনো ধৈর্যহীন ব্যক্তির কাছে আমি আমার পরম ভালোবাসার বস্তুকে বিক্রি করতে পারি না।”

মূল লেখাঃ রাসেল আল মামুন
(নবগঙ্গার তীর থেকে)

Author
Bangladesh Information

Bangladesh Information

"Bangladesh Information" is working on the goal of promoting Bangladesh in the world. Let's fulfill Bangladesh Information's goal, you can also raise the country with the help of the Bangladesh Information.

  • leave a comment

    Your email address will not be published. Required fields are marked *