চোখ দুটো

Mar 29, 2019
261 Views

মেয়েটির চোখ দুটো ছিল কদম ফুলের মতো ডাগর ডাগর। ঐ ডাগর ডাগর চোখের চাহনিই ছেলেটিকে পাগল করেছিল। মেয়েটিকে একনজর দেখার জন্য ছেলেটি প্রতিদিন কদমতলায় গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতো। মাঝে মাঝে কদমতলায় দাঁড়িয়ে সে নীরবে চোখের জল ফেলত। কিন্তু মেয়েটি কখনো ছেলেটিকে পাত্তা দিত না।

এভাবে মাসের পর মাস কেটে যায়। একটা সময় পর ছেলেটির প্রতি মেয়েটির অনুরাগ সৃষ্টি হয়। মেয়েটি বুঝতে পারে, ছেলেটি সত্যিই তাকে অনেক ভালোবাসে এবং ছেলে হিসেবেও সে মন্দ নয়। এরপর থেকেই শুরু হয় দুজনের মন দেওয়া-নেওয়া।

ছেলেটি কদম ফুল খুব ভালোবাসতো। প্রতিদিন দুটি করে কদম ফুল এনে সে তার প্রিয়ার খোঁপায় গুজে দিতো। মেয়েটি তখন লজ্জায় লাল হয়ে যেত। লাজুক মুখে সে তখন ছেলেটিকে বলতো, ‘প্রতিদিন কদম ফুল আনার দরকার কী কদম রাজা?’

মেয়েটি ছেলেটিকে ‘কদম রাজা’ বলে ডাকত। ছেলেটিও মেয়েটির একটা নাম দিয়েছিল- ‘রাণী কদম’। কদম রাজা ও রাণী কদমের প্রতিদিন দেখা হতো কদম গাছের তলে। দুজনই খুব স্বপ্নবিলাসী ছিল। রাণী কদম মাঝে মাঝে কদম রাজাকে উৎসাহ দিয়ে বলতো, ‘তোমাকে জীবনে অনেক বড় হতে হবে।’
কদম রাজা তখন ঠাট্টা করে বলতো, ‘না রাণী, বেশি বড় হলে ঝড়ে ভেঙ্গে যাব! তার চেয়ে চলো দুজনে বিয়ে করে একটা কুঁড়েঘর বাঁধি।’
এভাবেই প্রতিদিন নানারকম খুনসুটি, রাগ-অনুরাগের মধ্যে দিয়ে তাদের দিনগুলো কাটছিল। তাদের দুজনের পরিবারই তাদের সম্পর্কের কথা জানতো।

কদম রাজা ও রাণী কদম- দুজনের বাড়ি ছিল দুই গ্রামে। গ্রাম দুটির মাঝখানেই ছিল কদম গাছ। এই কদমতলাতেই প্রতিদিন দুজনের দেখা হতো। সেদিন ছিল রবিবার। অন্যান্য দিনের মতো সেদিনও কদম রাজা কদমতলায় গিয়েছিল। কিন্তু সেদিন রাণী কদম ওখানে আসেনি। অনেকক্ষণ অপেক্ষার পর কদম রাজা বাড়ি ফিরে আসে। কিন্তু তার মন ছটফট করতে থাকে। সেই রাতে তার ঘুম হয় না।

পরদিন খুব সকালে উঠেই কদম রাজা পাশের গ্রামে রাণী কদমের খোঁজ নিতে যায়। রাণী কদমের বাড়িতে পৌঁছেই সে ভয়ে শিউরে ওঠে। রাণী কদমের বাড়িতে আত্মীয়-স্বজনে ভরপুর। শুধু রাণী কদমই সেখানে নেই। এ দৃশ্য দেখে কদম রাজা চিৎকার করতে থাকে। তার চিৎকার শুনে অনেকেই ছুটে আসে। রাণী কদমের বাবা কদম রাজাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলে, ‘আমার মেয়েকে তুমি ভুলে যাও বাবা।’

রাণী কদমকে হারিয়ে অনেকটা নির্বাক হয়ে যায় কদম রাজা। সে কখনো ভাবতেও পারেনি তার রাণী তাকে এভাবে ধোঁকা দিবে। প্রচণ্ড দুঃখে কদম রাজা আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নেয়; কিন্তু পরক্ষণেই আবার মনে পড়ে রাণী কদমের কথা। রাণী কদম তাকে বলেছিল, ‘জীবনে বড় হতে হবে। কাপুরুষের মতো নয়, বীরের মতো বাঁচতে হবে।’

[পাঁচ বছর পর]

অনেক দিন বিদেশে কাটানোর পর দেশে ফিরে আসে কদম রাজা। এতদিন বিদেশে থাকলেও একমুহূর্তের জন্যও সে ভুলতে পারেনি রাণী কদমকে। বিদেশ থেকে ফিরে আজই সে রাণী কদমের সাথে দেখা করতে যাবে। আজও তার হাতে দুটি কদম ফুল।

প্রায় সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। মাঠের মধ্যে গোরস্থান। গোরস্থানের পাশে দাঁড়িয়ে আছে কদম রাজা। তার চোখ থেকে আষাঢ়ে বর্ষার মতো পানি গড়িয়ে পড়ছে। তার রাণী কদম যে এই গোরস্থানেই ঘুমিয়ে আছে। আজ থেকে পাঁচ বছর আগে ঝিনাইদহের এক সড়ক দুর্ঘটনা কদম রাজার কাছ থেকে কেড়ে নেয় তার রাণী কদমকে।

গভীর রাত। আকাশে মিটিমিটি তারা জ্বলছে। তারাগুলোর দিকে অপলক নয়নে চেয়ে আছে কদম রাজা। ঐ তারাগুলোর মধ্যেই যেন কদম রাজা দেখতে পায় তার রাণী কদমকে। রাণী কদম যেন হেসে হেসে তাকে বলছে, “যে ভালোবাসা দেহ থেকে সৃষ্টি হয়—তা শরতের শিশিরের মতো ক্ষণস্থায়ী; আর যে ভালোবাসা হৃদয় থেকে সৃষ্টি হয়—তা নীল সাগরের ঢেউয়ের মতো প্রবহমান। আমাদের দুজনের ভালোবাসা অনন্তকাল ধরে প্রবাহিত হবে সাগরের ঢেউয়ের মতো।”

মূল লেখাঃ রাসেল আল মামুন
নবগঙ্গার তীর, ঝিনাইদহ।

Author
Bangladesh Information

Bangladesh Information

"Bangladesh Information" is working on the goal of promoting Bangladesh in the world. Let's fulfill Bangladesh Information's goal, you can also raise the country with the help of the Bangladesh Information.

  • leave a comment

    Your email address will not be published. Required fields are marked *