ব্র্যান্ড অ্যাক্টিভেশানের কিছু কথা

Oct 22, 2017
405 Views

মাসখানেক আগে যে প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছিলাম, সে প্রশ্ন দিয়েই শুরু করছি। প্রশ্নটা ছিলো ব্র্যান্ড অ্যাক্টিভেশান নিয়ে। আবুল মোনেম গ্রুপ তাদের নতুন এবং অভিজাত আইস্‌ক্রীম ব্র্যান্ড মিয়া মোর এর কোন এক এক্সক্লুসিভ আউটলেটের শুভ উদ্বোধন করছে একটা আন্‌প্লাগ্‌ড মিউজিক্যাল ইভেন্ট আয়োজনের মাধ্যমে। যেখানে প্রোগ্রামের মূল আকর্ষণ হিসেবে থাকছেন প্রথিতযশা ব্যান্ড এল,আর,বি’র ভোকালিস্ট আইয়ুব বাচ্চু। তাদের এই প্রোগ্রামটাকে ব্র্যান্ড অ্যাক্টিভেশান প্রোগ্রাম বলা যায় কি না। আমাদের দেশে এ ধরনের প্রোগ্রামগুলোর প্রচলিত ধারা বিবেচনায় এ প্রশ্নের উত্তর হিসেবে কেউ একটি শব্দ প্রত্যাশা করলে ‘না’ বলাটাই যুক্তিসংগত মনে হয় আমার কাছে। কারণ, বাস্তব অভিজ্ঞতা বলে এ ধরনের প্রোগ্রামগুলোতে ব্র্যান্ড অ্যাক্টিভেশানের কিছুই হয় না যদি না, আপনি তাৎক্ষণিক সেলস্‌ বুস্ট্‌টাকেই ব্র্যান্ড অ্যাক্টিভেশান হিসেবে গণ্য করতে চান। এধরনের কতো প্রোগ্রামই তো আয়োজন করছে মিয়া মোর বেশ কিছুদিন পর পরই। অতিথি হিসেবে থাকছেন কখনো প্রবীণ প্রথিতযশা শিল্পী, কখনোবা কোন উঠতি নবীন আর্টিস্ট। কখনো আইয়ুব বাচ্চু, কখনো স্বাগতা আর কখনো এলিটা। এই টুকরো টুকরো ঘটনাগুলোর ক’টাকেই বা ভোক্তারা দীর্ঘমেয়াদী অভিজ্ঞতার এক সুতোয় গাঁথতে পারেন- সে প্রশ্নের উত্তরটা নিশ্চয়ই ইতিবাচক নয় আর ব্র্যান্ড অ্যাক্টিভেশান ব্যাপারটাও অবশ্য অবশ্যই এতোটা খাপছাড়া এলেবেলে গল্পসম্বৃদ্ধ নয় । চলুন জেনে আসি- কি আছে ব্যাপারটার গভীরতায়?

ব্র্যান্ড অ্যাক্টিভেশানের মতো একটি বহুল ব্যবহৃত শব্দের সাথে যে দু’টি পক্ষ ক্রমবর্ধমান তাৎপর্যপূর্ণতার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত তা হচ্ছে- ক্লায়েন্ট এবং এজেন্সী। ক্লায়েন্ট বা কোম্পানী- যারা বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করছেন তাদের বিজ্ঞাপনী বার্তার সত্যতা প্রমাণ করতে শুধুমাত্র নানা ধরনের কর্মকান্ডে জড়িত থাকার মাধ্যমে এবং এজেন্সী- যারা এই বিপুল পরিমাণ অর্থ গ্রহণ করছেন তাদের সৃজনশীল পরিচয় এবং কর্মতৎপরতার প্রমাণ দিতে শুধুমাত্র তাদের পোর্টফোলিওর আকার পরিবর্ধনের মাধ্যমে। দেখার বিষয় এখানে এটাই- ব্র্যান্ড বিষয়টার সাথে সৃজনশীলতা এবং কর্মতৎপরতার সুদূরপ্রসারী কোন সাজুয্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠছে কিংবা বজায় থাকছে কি না।

মূলতঃ একটা ব্র্যান্ডের খুব গভীরতম পর্যালোচনায় গিয়ে তার স্বকীয় এবং অনবদ্য কিছু গুণ ও বৈশিষ্ট্য নিয়ে কাজ করে ব্র্যান্ড অ্যাক্টিভেশান প্রোগ্রাম; এতোটা গভীরতম পর্যালোচনা যেখান থেকে ঐ ব্র্যান্ডের বর্তমান অবস্থান, সম্ভাবনা আর স্ট্র্যাটেজী অনুসন্ধানের মাধ্যমে এমন কোন ট্রাম কার্ডের খোঁজ পাওয়া যায় যা কোম্পানীকে সুদূরপ্রসারী সুবিধা এবং নিশ্চয়তা দিতে পারে। পুরো প্রোগ্রামের মূল লক্ষ্য আর সার্থকতা নিহিত থাকে কোন নির্দিষ্ট ব্র্যান্ডের সেই স্বকীয়তা আর অনবদ্যতার বিশ্বাস ভোক্তার মনে-প্রাণে স্থাপনার মাধ্যমে, যার ফলশ্রুতিতে ভোক্তা ঐ ব্র্যান্ডের প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টি পোষণ করে এবং তার নির্ধারিত চাহিদা পূরণে পুনঃ পুনঃ ঐ একই ব্র্যান্ডের পণ্য কিনতে বাধ্য হয়। মাথায় রাখতে হবে, ব্র্যান্ড অ্যাক্টিভেশানে মূলতঃ ধারাবাহিকতার সাথে অ্যাক্টিভেশান হয় একটা বিশ্বাসের। জানতে চান, কেমন করে? ঠিক যেমন করে একজন অপরিচিত মানুষ খন্ড খন্ড অসংখ্য ঘটনায় একটু একটু করে নিজের স্বার্থত্যাগের মাধ্যমে এ বিশ্বাসটাই আপনার মনে একটু একটু করে মজবুত আর স্থায়ী করে যে সে আপনার কতোটা খেয়াল রাখে, আপনার প্রতি কতোটা যত্নশীল সে। আর এমনি করেই আপনি নিজের অজান্তেই কোন একদিন তাকে অন্তরের অন্তঃস্থলে একান্ত আপনজনের স্থানটা দিয়ে থাকেন। সে হয়ে ওঠে আপনার একান্ত কাছের বিশ্বস্ত একজন। ব্র্যান্ড অ্যাক্টিভেশানও ঠিক এই কাজটাই করে একটা কোম্পানীর সমস্ত যোগাযোগ মাধ্যম আর সৃজনশীল কিছু কন্‌সেপ্ট বা আইডিয়ার সমন্বিত এবং সুষম ব্যবহার নিশ্চিত করে। যে আইডিয়ার পেছনে মূল ভূমিকা পালন করে একটা সুসংবদ্ধ দর্শন। সেই দর্শন যা আপনার প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি কাজ, প্রতিটি ভাবনার মাঝে একটা সাজুয্য বজায় রাখে এবং অবশ্যই সেটা আপনার সুনির্দিষ্ট ভোক্তাগোষ্ঠীর রুচি আর আগ্রহের বিষয়টি মাথায় রেখেই। ব্যাপারটা এমন, একটা নীল রঙের সান্‌গ্লাস পরে থাকা অবস্থায় আপনি যে দিকেই তাকান আর যাই দেখুন না কেন, তাতে নীলের উপস্থিতি কিংবা সংমিশ্রণ থাকেই থাকে। আপনি চাইলেও তা আর মুছে ফেলতে পারেন না, সান্‌গ্লাস খুলে ফেলার আগ পর্যন্ত। ব্র্যান্ডিং এর দর্শনটাও এমন। পার্থক্য এটাই যে, সান্‌গ্লাসটা থাকে চোখে আর দর্শনটা থাকে আপনার চিন্তার বাতিঘরে- যে বাতিঘরের আলোয় আপনার চলার পথের প্রতিটা দৃশ্য, প্রতিটা পদক্ষেপ থাকে এক অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা।

ব্র্যান্ড অ্যাক্টিভেশান আর ব্র্যান্ডিং এর দর্শনের ব্যাপারে জানা গেলো। এবার চলুন জানি- অ্যাক্টিভেশানটা করতে পারেন কি ভাবে। অ্যাক্টিভেশানের জন্য প্রথমেই আপনাকে যে কাজটি করতে হবে তা হচ্ছে, ব্র্যান্ডের চাহিদাকে উদ্দীপিত করার জন্য সক্রিয় করতে হবে ভোক্তার আবেগকে। অর্থাৎ, আপনি ভোক্তার সুপ্ত চাহিদাকে উস্কে দেবার জন্য তাড়িত করবেন তার আবেগকে- যার জন্য প্রয়োজন একটি মানসম্পন্ন আইডিয়ার। কারণ একটি মানসম্পন্ন কন্‌সেপ্ট যেমন ভোক্তাকে আপনার ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডরে পরিণত করতে পারে, ভোক্তা নিজের গরজেই আপনার ব্র্যান্ডের মেসেজকে ছড়িয়ে দিতে ভাইরাস ছড়ানোর মতো করেই, ঠিক তেমনি একটি দূর্বল ও অবিশ্বাসযোগ্য কন্‌সেপ্ট আপনার পুরো অ্যাক্টিভেশান প্রোগ্রামকে পৌঁছে দিতে পারে অর্থহীনতা আর ব্যর্থতার চরম সীমায়। আর তাই আইডিয়া প্রণয়ণের সময় আপনাকে দু’টি বিষয় গুরুত্বের সাথে বিবেচনায় রাখতে হবে – আপনার আইডিয়া ভোক্তার আগ্রহ বা পছন্দের বিষয়বস্তুর সাথে কতোটা দৃঢ়ভাবে সম্পৃক্ত এবং আপনার আইডিয়ার সাথে সম্পৃক্ত থাকার বিনিময়ে ভোক্তা কি পাওয়ার আশা রাখেন- অর্থাৎ, এক্ষেত্রে ভোক্তার প্রতি ব্র্যান্ডের প্রত্যুত্তরের ভাষা আর স্বরটা কেমন হতে পারে। হতে পারে তা সহানুভূতি কিংবা সম্মান, কিংবা দু’টোরই সুষম মিশ্রণ। এরপরের লক্ষ্য রাখার বিষয়- আইডিয়াটা কতোটা জটিল বা সরল রাখবেন আপনি। অ্যাক্টিভেশান প্রোগ্রামের সাথে ভোক্তার সম্পৃক্ততার সম্ভাবনা তীব্র এবং এ থেকে তার প্রাপ্য সম্মানীর পরিমাণ বেশি হলে অর্থাৎ ভোক্তারা আপনার ব্র্যান্ডের একনিষ্ঠ ভক্ত হয়ে থাকলে তারা এ কাজের পেছনে অধিকতর সময় এবং মেধা প্রয়োগে প্রস্তুত থাকবেন। সেক্ষেত্রে কন্‌সেপ্টটাকে জটিলতার মাত্রায় রাখা যেতেই পারে। অন্যথায়, কন্‌সেপ্টকে যথাসম্ভব সরলতার মাত্রায় রাখাই শ্রেয়। অতঃপর নির্বাচিত আইডিয়াটিকেই বাস্তবায়িত করতে হবে সঠিক সময়, সঠিক জায়গা এবং সঠিক উপায়ে খুঁজে। যদিও এটাও ঠিক যে, বর্তমানের এই দ্রুত পরিবর্তনশীল যোগাযোগ মাধ্যমের যুগে সঠিকতার নির্দিষ্ট আর চিরস্থায়ী কোন মাপকাঠি নেই। এজন্য আপনাকে নিত্য-নতুন প্রযুক্তি আর সামাজিকতার নানা ধরনের প্ল্যাটফর্মের ব্যাপারে অবগত থাকতে হবে। নতুনত্বের প্রতি আপনাকে বজায়ে রাখতে হবে ইতিবাচক এবং আগ্রহী দৃষ্টিভঙ্গি। প্রয়োজনে আপনাকে ভোক্তা মনোবিদ্যার সাহায্যও নেয়া লাগতে পারে। আর একটা কথা- আপনাকে অবশ্যই ব্র্যান্ড ম্যানেজার নির্বাচনে অধিক্‌তর যত্নশীল থাকতে হবে। আপনার কোম্পানীর ব্র্যান্ড ম্যানেজারকে হতে হবে অনেক বেশি চিন্তাশীল আর উদ্ভাবন-পিপাসু। চিন্তাশীল- কারণ, ব্র্যান্ডের অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জনের জন্য তাকে জানতে হবে কি করে একটা ধারণার জন্ম হয়। বিশ্লেষণের সুবিধার্থে সে ধারণাকে কতোটা সূক্ষাতিসূক্ষ স্তরে ভাঙা যায় আর অ্যাক্টিভেশানের নানা কর্মকান্ডের সাথে সে সূক্ষাতিসূক্ষ ধারণার অংশবিশেষ কি করে কতোটা নিশ্চয়তা আর সফলতার সাথে সম্পর্কিত করা যায় সে বিষয়ে বিরতীহীনভাবে চিন্তা করে যেতে হবে। উদ্ভাবন-পিপাসু- কারণ, দ্রুত পরিবর্তনশীল বাজার-রুচি আর যোগাযোগ মাধ্যমের যুগে তাকে প্রতিযোগীদের ডিঙিয়ে ভোক্তার দৃষ্টি আকর্ষণ আর বিশ্বাস স্থাপনার জন্য অভিনব পন্থার অনুসরণ করতে হয়। বাজার জ্ঞানের কথা বিশেষ করে উল্লেখ করছি না। কারণ, ব্র্যান্ড ম্যানেজার হিসেবে মার্কেটিং ব্যাকগ্রাউন্ডের কাউকেই নির্বাচিত করবেন এটাই সাধারণ জ্ঞানের কথা। আর ছ’বছর মার্কেটিং বিষয়ে অধ্যয়ন করার পর বাজারজ্ঞান কম-বেশি সবারই থাকে। অন্ততঃ এই উন্মুক্ত তথ্যব্যবস্থার বিশ্বে তো সেটাই স্বাভাবিক। সব শেষ কথা, এজেন্সী নির্বাচন নিয়ে। এজেন্সী নির্বাচনের ক্ষেত্রে আপনাকে তাদের পোর্টফোলিওর আকার, শক্তিশালী কর্পোরেট কাঠামোর থেকেও যে বিষয়টা বেশি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে হবে তা হচ্ছে- তারা তাদের কর্মজীবনে ক্রম-উদ্ভাবনার ধারা বজায় রাখতে পেরেছে কি না কিংবা পারলেও তা কতোটুকু।

কি ভাবছেন- ব্যস, এটুকুতেই শেষ। আরও অনেক কিছুই কি জানার ছিলো না! অন্ততঃপক্ষে, কিছু মডেল, থিওরী, সুবিধা-অসুবিধা, ব্লা ব্লা ব্লা। ওসব বহিঃত্বকের কথা- আপনাদের অধিকাংশেরই জানা। আর যাদের জানা নেই তাদেরও দুঃশ্চিন্তার কোন কারণ নেই। কারণ, ওসব অনেক সহজলভ্য- ব্র্যান্ডিং এর যেকোন পাঠ্যপুস্তক কিংবা গুগল সার্চ করলেই পেয়ে যাবেন।

শেষ করছি এই লেখা শুরুর সেই প্রশ্নের ইতিবাচক উত্তর দিয়েই। সম্ভবেরই সময় এখন। উপলব্ধি আর অন্তঃসারে স্বচ্ছতা আর পর্যাপ্ততা থাকলে যে কোন ব্রান্ডের এমন অনেক এলেবেলে উদ্বোধনী প্রোগ্রামকেই সফল ব্র্যান্ড অ্যাক্টিভেশান প্রোগ্রামে পরিণত করা সম্ভব। সম্ভবকেই স্বাগত জানাচ্ছে বিশ্বব্যাপী সবাই। আপনি বা আপনার মতো আরও অনেকেই বা কেন অসম্ভাবনা নিয়ে পিছিয়ে থাকবেন! সম্ভবেই ফিরছেন- এই আশা ব্যক্ত করে আজকের মতো এখানেই শেষ করছি।

 

By, Mamun

 

Author
  • leave a comment

    Your email address will not be published. Required fields are marked *