একদিনে ৫৫ কিঃমিঃ হাঁটার গল্প

Feb 09, 2020
223 Views

কাটা পাহাড় সড়ক ধরে হাঁটতেছি; এমন সময় হঠাৎ জিরো পয়েন্টের মসজিদ থেকে সুললিত কণ্ঠের আজান ভেসে এলো। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি, ভোর পাঁচটা বেজে চল্লিশ মিনিট। হল থেকে বের হওয়ার সাত মিনিট হয়ে গেছে ইতিমধ্যে, অবশ্য জিরো পয়েন্টের খুব কাছাকাছি চলেও এসেছি।

কুয়াশা তেমন ছিলোনা বলে রুম থেকে বের হওয়ার সময় ভাবছিলাম, চাদরটা নিবো কিনা। কিন্তু ১নং গেইটের রাস্তা দিয়ে হাঁটার সময় বাতাসের তীব্রতা বারবার স্মরণ করিয়ে দিচ্ছিলো চাদরটা নেওয়া বোকামি হয়নি, বরং উপকারই হয়েছে। খুব দ্রুতই এক নং গেইট ছেড়ে হাটহাজারীর দিকে পথ ধরলাম। বাতাসের গতিবেগ ক্রমশ বেড়েই চলেছে, বাতাসের গতিকে উপেক্ষা করতে ক্রমশ আমার হাঁটার গতিও বাড়াচ্ছি।

হাঁটতে বের হইলে অনেক কিছুই তো চোখে পড়ে, সবগুলো বলা হয়না। মাঝে মাঝে অনেক কিছু এড়িয়ে যাই কিন্তু ২নং গেইটের একটু পরেই যে ‘কসমেটিক খতনা সেন্টার’ আছে সেটা কেন যেন সকাল সকাল খুব চোখে পড়লো। এই জিনিস প্রথমবার চোখে পড়েছিলো যেবার চ.বি থেকে চাড়িয়া হেঁটে যাই।

হাটহাজারীতে কুটির শিল্প মেলা হবে সেইজন্য এইজন্য সময়েও চলছে পুরোদস্তর প্রস্তুতি। ধরণীতে এখনও সূর্যের আলো ফুটেনি। মনে মনে ভাবছি ইছাপুরের ওই দিকটায় গিয়ে যদি সূর্যোদয় দেখতে পারতাম খুব ভালো লাগতো। হাটহাজারী কলেজ অতিক্রম করে চলে এলাম “ধন্যবাদ হাটহাজারী” লিখা সম্বলিত বিশাল এক সাইন বোর্ডের সামনে। হাঁটার গতিতে থেকেই দু’চারটা ছবি তুলে ব্রিজের উপরে উঠলাম।

পথে দু’চারজন মানুষ হাঁটতেছে আর মাঝে মাঝে সাঁই সাঁই শব্দ করে দু’চারটা সিএনজিও চলছে। চট্টগ্রামের এই এলাকাটায় বোধহয় সবচেয়ে বেশি সিএনজি চলে। কারণ সেই সকালেই হাটহাজারীতে আমাকে এক সিএনজির ড্রাইভার বেশ কয়েকবার জিজ্ঞাসা করেছে আমি রাউজান যাবো কিনা!! “ভাড়া কমায় রাখবো আসেন মামা” বলার পরও গেলাম না দেখে উনি হয়তো মন খারাপ করছে।

ইছাপুর বাজার পৌছে সকালের নাস্তা সেড়ে নিলাম। স্ট্রাভার দিকে তাকিয়ে দেখি ১০ কিঃমিঃ হেঁটেছি। চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে চাদর গুছিয়ে ব্যাগে রেখে রাখলাম। লক্ষ্য থেকে আরো পয়তাল্লিশ কিঃমিঃ দূরে আছি এখনও। বাজারের দু’চারজন লোক বেশ কৌতুহলী দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে আমার দিকে। হাঁটার গতি পূর্বের চেয়ে কিছুটা বাড়ানোর চেষ্টায় আছি ঠিক এমন সময় চোখে পড়লো “হালদা সেতু’।

সেতুর সামনে দাড়িয়ে থাকা এক ভাইয়ের কাছে দাঁত কেলানো হাসি দিয়ে একটা ছবি তুলে নিলাম। ঘড়িতে সকাল ৮ টা, শীতের সকালের মিষ্টি রোদ বলে যেমনটা জানি, আজকের সকালের রোদটা তেমন না। কিন্তু যতটুকুই উঠেছে সেটুকুই বা আর খারাপ বলি কি করে!! আবছা রোদ-ছায়ার খেলা দেখতে দেখতে হাঁটছি অচেনা পথ ধরে, জানা গন্তব্যের উদ্দেশ্যে।

গহিরা বাজারে এক মুহুর্তও না দাড়িয়ে, চলে এলাম গহিরা কলেজেন সামনে। বেশ সবুজ ঘাসে ঢাকা বিস্তীর্ণ মাঠের পাশে লাগোয়া বড্ড কয়েকটা ভবন। কলেজের পাশের রাস্তা দিয়ে কিছুক্ষণ হেঁটে, পানি খাওয়ার জন্য ঢুকলাম একটা ছোট্ট টঙ দোকানে। রাউজান সৎসঙ্গ সেন্টারের একটু সামনেই দেখা হলো অংকনের সাথে। বয়সে খুব পিচ্চি হলেও কথায় পাঁকা। ক্লাস ফোরে পড়ে সে, আমার সাথে খুব অল্প সময় হাঁটলোও।

অংকনকে ছেড়ে আসার একটু পরেই দেখা ক্লাস টু’তে পড়া আদিত্যের সাথে। ক্লাসের দুই রোলের ছাত্র সে। নাম জানতে চাইলাম, পুরো নাম বলেই পাল্টা আমার নামও জানতে চাইলো। আদিত্যে আর অংকনের মাঝে ছোট্ট ব্যবধান হিসেবে আমি ডাবুয়া নদীকে মনে রাখবো কারণ রাউজানে প্রবেশ করার আগে ডাবুয়া নদী ছেড়ে এসেছি।

প্রচন্ড গরম লাগার কারণে জ্যাকেট খুলে হাতে নিয়ে নিয়েছিলাম হালদা নদীর পরেই, সেই হাতে রাখা জ্যাকেট ব্যাগে ভরলাম। আমার দিকে আড়চোখে তাকিয়ে দেখতে দেখতে বড্ড একটা কাপে চা পরিবেশন করলেন এক ভদ্রলোক। টিস্যু দিয়ে মুখ মোছার আগেই চশমাটা চোখে দিয়ে আমিও উনার দিকে তাকিয়ে একটা মুচকি হাসি দিলাম। চা খেতে খেতে ম্যাপে তাকিয়ে দেখি, আমি যেখানে বসা সেখান থেকে আমার গন্তব্য আরো সাইত্রিশ কিঃমিঃ দূরে, ঘড়িতে সময় সকাল ৯.৩৩ মিঃ

রাউজানে থাকতেই ফোনে কথা হলো শাহাদাত ভাইয়ের সাথে, উনি কিছু ইন্সট্রাশনও দিলেন। এখান থেকে হাঁটা শুরু করার পর থেকেই জুতায় সমস্যা মনে হচ্ছিলো। কিছুদূরে হেঁটে খেয়াল করলাম, জুতার পিছনের অংশ কিছুটা খুলে এসেছে। সামনেই কোথাও বসে ঠিক করবো এমন ভাবনা রেখে হাঁটতে হাঁটতেই চৌধুরীহাট ছেড়ে এলাম। রাস্তার পাশে ছোট্ট একটা সাঁকোর উপর বসে জুতা জোড়া ঠিক করলাম সুপার গ্লু দিয়ে৷ জুতা নষ্ট হওয়া বা ছিড়ে যাওয়ার এই কাহিনী নতুন কিছু না আমার কাছে। সেইজন্য সুপার গ্লুও সাথেই রেখেছি। (ঐতিহাসিক এই ছেড়া জুতা জোড়ার গল্প আরেকদিন বলবো- ইনশাআল্লাহ)

আলিখীল নামের ছোট্ট বাজারটা অতিক্রম করতেই চোখে পড়লো চারিদিক প্রাচীর দেওয়া একটা এড়িয়া। কিছুদূর সামনে হেঁটে গিয়ে দেখলাম বড় একটা গেইট বানানো, যেটার উপরে বাঙলায় স্পষ্ট করে লিখা- “রাউজান পিংক সিটি”। নামের সাথে কারো কোন প্রকার কোন কিছু না খুঁজে আমি বরং হাঁটতেই থাকলাম। হাঁটতে হাঁটতে আমি লোকালয় ছেড়ে জঙ্গলের ভিতরে ঢুকা শুরু করলাম, পেছনে ফেলে এলাম নাম না জানা ছোট্ট একটা নদীকেও।

হাতে গোনা চারজন পুলিশের মোট আটটা চোখ আমার দিকে তাকিয়ে আছে, কিছু একটা হয়তো বলতেছেন নিজেরা নিজেরাই কিন্তু একটু বেশি দূরত্ব থাকায় শুনতে পাচ্ছিনা। আমি আমার মতোই হাঁটতেছি, চোখ পড়লো রাস্তার পাশে দাড়িয়ে থাকা ‘স্বাগতম রাঙামাটি’ লিখা পিলার। চট্ট ছেড়ে আমি এতক্ষণে রাঙাতে ঢুকতে পেরেছি  ভেবে ভালোও লাগছে খুব।

ঘড়িতে ১০:৫৪ মিনিট। ছোট্ট একটা টঙ দোকানে এক গ্লাস পানি খেয়ে ফের শুরু করলাম হাঁটা। বেতুবুনিয়া বাজার পৌছানোর আগে মনারটেক নামক একটা জায়গাও চোখে পড়লো কিন্তু থামিনি শুধু সময় স্বল্পতার কারণে। বেতবুনিয়া যখন পৌছাই তখন ঘড়িতে বারোটা বাজতে আরো কয়েক মিনিট বাকি। এদিকটার রাস্তাগুলো বেশ দূর্গম এবং বেশ ভয়ানক। ভয় পাওয়া শুরু হয়নি এখনও এবং জানিও না কি অপেক্ষা করছে আমার জন্য।

পুলিশ স্পেশাল ট্রেনিং স্কুলের একটু পরেই বেতবুনিয়া মাদ্রাসা। অবশ্য এর মাঝে ছোট দু’একটা দোকান আর একটা স্কুলও আছে। ছয়টা নতুন বই হাতে নিয়ে হেঁটে আসতেছে মাদ্রাসা পড়ুয়া এক পিচ্চি৷ চোখে মুখে তার এক দুনিয়া সমান স্বপ্ন। ছবি তুলতে দেখেই নিজেকে গুটিয়ে ফেলার আগেই আমি একটা ছবি তুলে ফেলেছি।
বেতবুনিয়া বাজারে নাস্তা খাওয়ার ফাঁকে কিছুক্ষণ ফোনটা চার্জ করেছি, আপাতত কয়েকঘন্টা বেশ নিশ্চিত থাকা যাবে।

আমার সাথে পাল্লা দিয়ে দু’জন পিচ্চিও হাঁটা শুরু করেছে রাস্তার অপর পার্শ্বে, ওদের দৌড় আর আমার হাঁটার পাল্লা। ওদেরকে আনন্দ দিতে দিতে একটা বাজারও অতিক্রম করেছি কিন্তু বেখেয়ালি হয়ে বাজারের নামটা দেখা হয়নি পরখ করে। সবকিছু ছেড়ে ছুড়ে এবার প্রবেশ করলাম জঙ্গলে। রাস্তার দুই পাশেই উঁচু উঁচু পাহাড়, আর সামনের পথটা যেন চলে গিয়েছে সেই পাহাড়ের চূড়ায়। নির্জনতার ছোয়ায় প্রথমবারের মতো ভয় পেয়ে গেলাম।

হাঁটা শুরু করলাম পূর্বের তুলনায় কিছুটা দ্রুত ঠিক এমন সময় ঘটলো আরো একটা ঘটনা। একে তো নির্জন রাস্তায় অচেনা পথিক আমি, তার উপর আনুমানিক পচিঁশ/ত্রিশ বছর বয়সের একজন মানুষ রাস্তার পাশে সাইকেল থামিয়ে দাড়িয়ে আছে। চোখে কৌতুহলের বিন্দুমাত্র ছাপ নেই, যা আছে তার পুরোটাই সন্দেহ। কেমন যেন অদ্ভূত রকম করে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। উনার তাকানো দেখেই তো আমার অবস্হা খারাপ, ভয়ে হাঁটু কাপতেছে আমার। ঠিক এমন সময় সামনের রাস্তাটাও যেন আরো উঁচু মনে হলো, যেটা বলে বুঝানোর মত না।

অনেক উঁচু উঁচু দুইটা রাস্তার অতিক্রম করে কিছুটা সমতলে এলাম এবার৷ পুরো এলাকা জুড়েই শুধু আমি একটা মানুষ আর মাথার উপরে দুপুরের সূর্য। মাঝে মাঝে শত কিঃমিঃ বেগে দু’চারটা গাড়ি পাশ দিয়ে সাঁই সাঁই করে যাচ্ছে। চারিদিক দেখতে দেখতে হাঁটতেছি ঠিক এমন সময় সামনে এলো হাকিমপুর মাদ্রাসা। মোট পাঁচজন মাদ্রাসা পড়ুয়া ছাত্র হেঁটে হেঁটে দাওয়াত খেতে যাচ্ছে। আমাকে হাঁটতে দেখে ওরাও হাঁটার গতি বাড়িয়ে দিয়েছে। পিছনে তাকিয়ে দেখি ওরা রীতিমতো দৌড়ানোর পর্যায়ে।আমার হাঁটার গতি কিছুটা কমিয়ে শুরু করলাম গল্প, আমার প্রশ্নের ধরণ দেখেই ওরা কিছুটা ধারণা করছে আমি মাদ্রাসায় পড়ছিলাম মনে হয়!!

বেশ হাসিমুখেই ওদেরকে বিদায় দিয়ে হাঁটতেছি আমি। একটু পরেই শুনি কয়েকজন বাচ্চা কোথায় যেন চিল্লাচ্ছে, তাকিয়ে দেখি মাদ্রাসার সেই পিচ্চিরা সিএনজি থেকে আমাকে ডাকতেছে আর হাত নাড়তেছে। ডান হাত নেড়ে ওদেরকেও অভিবাদন জানাইলাম। ঠিক এই মূহুর্তের সূর্যের তাপমাত্রা আমার পক্ষে হলেও পেটের অবস্হা মোটেও আমার পক্ষে না। ম্যাপে দেখলাম রানীর হাট থেকে তখন আর মাত্র কয়েক কিঃমিঃ দূরে আমি। দুপুরের খাবার ওখানেই খাবো সিদ্ধান্ত নিয়েই হাঁটতে থাকলাম।

ঘড়িতে দুপুর ১টা ০৪ মিনিট। রানীর হাটে পৌছেছি। রানীর হাটের প্রবেশমুখেই ইছামতি নদী। মৃতপ্রায় নদীটা দেখে খারাপই লাগলো, বাংলাদেশের প্রায় সব নদীরই অবস্হা এরকম। নদীর পানি শুকিয়ে যাচ্ছে, নদী ভরাট করতেছে, যে যার মতো দখল করে ইমারত গড়তেছে। হাটে প্রবেশ করার আগে আবার দেখা হয়েছিলো মাদ্রাসার পিচ্চিদের সাথে। দূর থেকে দেখেই ওরা দৌড়ে আসা শুরু করেছে। আমিও এগিয়ে গেলাম, ওরা শুনেই অবাক হয়ে গেছে যে আমি এতটা পথ হেঁটে গেছি।

রানীরহাটেরই ছোট্ট একটা হোটেলে দুপুরের ভাত খেতে খেতে ফোন কথা হলো বাবর ভাইয়ের সাথে। ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা ঘুরে আসলেন তিনি কিছুদিন পূর্বেই। সামনের রাস্তা সম্মন্ধে জানতেই কল দিয়েছিলাম ভাইকে। আরো অনেক কথা হলো, পজিশনে কে আগে কে পরে, কে কীভাবে ঘুরে না ঘুরে ইত্যাদি বিষয়াশয় নিয়েও কথা হলো।

চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে জুতা পরলাম। খাবারের মান বেশ ভালোই, পরের বার গেলে একবার ঢু মেরে যাবো এমন সিদ্ধান্ত নিয়ে হাঁটা শুরু করলাম দ্বিতীয় দফায় এবং যত ভয়ংকর ঘটনাবলি সব এখানেই। ঘড়িতে দুপুর ১:৫৬ মিনিট, রানীরহাট ছেড়ে বেরিয়েছি আমি। রাঙামাটি আর মাত্র ২১ কিঃমিঃ দূরে। সময় যদি দুপুর দুইটা থেকে ধরি তাহলে আমার লক্ষ্য বিকাল পাঁচটার মধ্যে রাঙামাটি পৌছানো। অর্থাৎ আমাকে তিন ঘন্টায় ২১ কিঃমিঃ হাঁটতে হবে। আমি নিজেও জানিনা কীভাবে হাঁটবো, তবে এতটুকু শুধু জানি আমাকে পৌছাতেই হবে।

রানীরহাটের পরে রাস্তার অবস্হা ভয়াবহ রকমের খারাপ। ভাঙা রাস্তায় হাঁটা এমনিতেই অনেক কষ্টকর তার উপর রাস্তায় ভাঙা পাথরের টুকরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা। শুধু একমনে হাঁটতে বেশ বেগ পেতে হচ্ছে কিন্তু তারপরও সবকিছু মেনে নিয়ে হাঁটতেছি। হাটার গতি ঘন্টায় ৬.৩/৪ উঠানামা করতেছে। এরই মধ্যে পাহাড়ি রাস্তায়ও ঢুকে পরেছি। এই রাস্তাটার দুইধারে পাহাড় হলেও মানুষের চলাচল থাকায় তেমন ভয় লাগতেছে না।

মাথার উপরে থাকা সূর্যের আলো স্তীমিত হতে শুরু করেছে, কয়েক মিনিটের মধ্যেই সূর্য তার সকল আলো নিভিয়ে দিয়ে মেঘের আড়ালে হারালো। ঘুটঘুটে অন্ধকার না নামলেও, অপরিচিত রাস্তায় একা হাঁটার জন্য একজন পথিকের যতটুকু আলো প্রয়োজন ততটুকু বিদ্যমান নেই। সুতরাং অন্ধকারের একটা ভয় আমার সাথী হয়ে গেলো বাকিটা পথ। কাউখালী বেস্টহাট পুলিশ ক্যাম্পের পূর্বে আরো অনেক উঁচু একটা রাস্তা অতিক্রম করলাম।

পুলিশ ক্যাম্পের পরেই অনেক বড় রকমের মোড়। তার একটু পরেই আরো একটা ভয়ংকর মোড় যেটাতে গত কয়েকদিনে মোট তিনজন মারা গিয়েছেন। গতকাল বিকালে একজন সাইক্লিস্ট ভাই মারা গিয়েছেন এই মোড়ে। উনার রক্তের লাল রঙটা এখনো ভেসে আছে রাস্তায়। পূষণকে পাঠানোর জন্য একটা ছবি তুলে নিলাম।গায়ের লোম দাড়িয়ে গিয়েছে রীতিমতো, কারণ আমি একা অন্ধকারাচ্ছন্ন এমন এক রাস্তায় হাঁটতেছি যেখানে কিনা কয়েকদিন পরপরই দূর্ঘটনা ঘটে।

ঘাগড়া বাজারের মোড়েই ছোটখাট একটা আর্মির বুথ বসানো। বরাবরের মতোই আমার দিকে তাকিয়ে আছে মোট তিন জোড়া আর্মির চোখ কিন্তু আমি তো ফিরেও তাকাইনা এমন একটা ভাব নিয়ে হাঁটতেছি। ঘাগড়া বাজার ছেড়ে একটু পরেই পেলাম ঘাগড়া আর্মি ক্যাম্পের বিশাল সাইনবোর্ড। কলাবাগান গাউছিয়া জামে মসজিদের সদর দরজার সামনে, পৌছানো মাত্রই আসরের আজান কানে ভেসে এলো। ঘড়িতে তাকিয়ে দেখি ৩:৪৭ মিনিট।

ঘাগড়ার পরের গল্পগুলো একটু বেশি ভয়ংকর। ঘাগড়া বাজার ছেড়ে আসার পর থেকেই কেন যেন বারবার মনে হচ্ছিলো বেশি ঝুঁকি নিয়ে ফেলেছি। দুইপাশে উঁচু উঁচু পাহাড়, কোথাও কোন বাড়িঘরের ছিটেফোঁটা নেই। হাঁটতেছি তো হাঁটতেছিই, যেন অনন্তকালের পথে পা বাড়িয়েছি; যার কোন শেষ নেই। সাথে নেওয়া বোতলের পানিটুকুও ফুরিয়ে গেলো, রাস্তার আশেপাশে কোন বাড়িঘরও নেই যে বোতলে পানি নিবো কিংবা কারো বাড়িতে গিয়ে পানি খেয়ে নিবো।

মানিকছড়ি যাওয়ার আগে সবচেয়ে উঁচু যেই রাস্তা, ঠিক তার একদম মুখোমুখি এসে আমি আর হাঁটতে পারতেছিনা। বোতলে পানিও নেই যে, পানি খেয়ে বিশ্রাম করবো। ঘড়িতে সময়ও নেই যে, কিছুক্ষণ কোথাও বসবো এবং সবচেয়ে অবাক করা ব্যাপার হলো ঠিক ওই সময়টাতে রাস্তায় গাড়ি চলাচলের পরিমাণটাও কমে গেলো। সবকিছু যেন আগে থেকেই নির্ধারিত করা ছিলো।

চশমা খুলে হাতে নিয়েছি, শরীর দরদর করে ঘামা শুরু করেছে। যেখানে দাড়িয়ে আছি সেখান থেকে কোনভাবে একটু এদিক সেদিক পা পিছলে গেলে কয়েকশ’ত মিটার নিচে গর্তে চলে যাবো চোখের পলক ফেলার আগেই। হাঁটা একদম থামিয়ে দিয়েছি প্রায়। একবার ভাবলাম সিএনজিতে উঠে বাকিটা পথ যাবো কিন্তু পরক্ষণই ভাবলাম এতটা পথ এসেছি, আর এইটুকু পথ!! এবং তখনই জীবনের সবচেয়ে বড় ঝুঁকিটা নিয়ে হাঁটা শুরু করলাম। যেন নতুনভাবে আমি কেউ হাঁটছি, পুরো দিনের কোন কিছুই আমার মাথায় নেই, এমনকি শুধু আমার বেচে ফেরার চিন্তা ছাড়া আর কিছুই নেই মাথায়।

মানিকছড়ি পর্যন্ত সময়টা ঠিক কেমন গেছে শুধু একটু লিখে রাখলাম। নিজের সাথে না ঘটলে, এই সিচুয়েশন গুলা আসলেই কেমন যায়, এইটা কোনদিনই লিখে বোঝানো সম্ভব না। সেদিনের সূর্যাস্ত ৫.২০ মিনিটে হওয়ার কথা থাকলেও, সূর্য তো অনেক আগেই হারিয়ে গিয়েছে। মানিকছড়ি বাজারের পরে আরো কয়েকটা উঁচু রাস্তা আছে। এগুলোতে উঠতে রীতিমতো আমার হামাগুড়ি দিয়ে যাওয়ার মত অবস্হা, তবুও আমার মুখে হাসি। কারণ গন্তব্য থেকে আর মাত্র কয়েক কিঃমিঃ দূরে আমি।

শরীরের ভাঙাচুড়া অবস্হায় চলে এলেও, মনটা বেশ চাঙ্গাই আছে এখন পর্যন্ত, তার উপর রাস্তার ঝুঁকিপূর্ণ মোড়গুলোতে বড় বড় আয়না লাগনো। যদিও এগুলো লাগানো হয়েছে মূলতঃ অপর দিকের গাড়ি আসতেছে কিনা এটা খেয়াল করার জন্য কিন্তু আমার তো এখন অতশত হিসাব করার দরকার নেই। চাঙ্গা মনটাকে আরো চাঙ্গা করতে আয়নার সামনে দাড়িয়ে দু’চারটা ছবিও তুললাম।

রাঙামাটি পাসপোর্ট অফিসের একটু পরেই বেতার ভবন। বেতার ভবনের পরেই একদম নিচের দিকে নেমে যাওয়া একটা রাস্তা, কিছুদূর গিয়ে সেটা আবার অনেক উঁচুতে উঠেছে। দেখতে সুন্দর ভয়ানক এই রাস্তাটার একদম শেষ প্রান্ত পর্যন্ত যেতে যেতে হাপিয়ে উঠেছি এবং….

আলহামদুলিল্লাহ ✌

এখন পর্যন্ত একদিনে হাঁটার রেকর্ডে এটাই আমার সর্বোচ্চ দূরত্ব অতিক্রম করা। অনেক বেশি ঝুঁকি নিয়ে ফেলেছি।
শাহাদাত ভাই, বাবর ভাই শুনলে আমাকে বকা দিবেন নিশ্চিত। এতটা ঝুঁকি নেওয়া উচিত হয়নি যদিও কিন্তু তারপরও একটু মনটা চাইলো নিতে। জীবনটাকে চেনার জন্য, মাঝেমধ্যে দু’একটা চ্যালেঞ্জ নিতে হয়।

(দীর্ঘ সময় নিয়ে আমার এই অগোছালো লিখাটা পড়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। আমার জন্য দোয়া করবেন)

#পদব্রজে_স্বদেশ_ঘুরি

Author
  • leave a comment

    Your email address will not be published. Required fields are marked *