মৈনট ঘাট – গরীবের কক্সবাজার

Jun 15, 2019
208 Views

শহরের যান্ত্রিকতা যখন গ্রাস করে নিবে, যখন আপনি চাইবেন একটু শীতল হাওয়া, তখন আপনি খুজে পেতে চাইবেন সমুদ্রের শীতল স্পর্শ। কিন্তু জীবনের ব্যস্ততায় সময় ও সুযোগ হয়তো আপনার সেই আশাকে দুরাশাতে পরিণত করে দিবে। তবে আপনি চাইলেই কিন্তু সমুদ্রের ছোয়া উপভোগ করতে পারেন ঢাকার অদূরে নবাবগঞ্জের মৈনট ঘাটে। পদ্মার এই পাড়ে গেলে আপনার মন অজান্তে বলে উঠবে এ যেন মিনি কক্সবাজার। নদীর ছোট ছোট ঢেউ এসে আছড়ে পড়ছে সাগরের ন্যায় বেলা ভূমিতে। সূর্যের আলোতে চিকচিক করছে বালিকনা।

মৈনট ঘাট ঢাকার দোহারে অবস্থিত, যেখানে গেলে আপনি মুগ্ধ হবেন, বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে থাকবেন পদ্মা নদীর অপরূপ জলরাশির দিকে। এই বিশাল জলরাশি, পদ্মায় হেলেদুলে ভেসে বেড়ানো জেলেদের নৌকা দেখা আর পদ্মার তীরে হেটে বেড়ানো, সব মিলিয়ে কিছুক্ষণের জন্য আপনার মনে হবে আপনি এখন ঢাকার দোহারে নয়, কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে আছেন।

মৈনট ঘাট পরিদর্শনের উপযুক্ত সময় হচ্ছে বর্ষাকাল। তখন রাস্তার দুই পাশের নিম্নভূমি পদ্মার পানিতে তলিয়ে যায়। সে এক দেখার মতো দৃশ্য। শুকনায়ও এর সৌন্দর্যের কমতি নেই। তখন দেখা যাবে পদ্মা নদীর শান্ত রূপ। একটা সন্ধ্যায় পদ্মা নদীতে সূর্যাস্ত দেখলে পরবর্তী একশোটা সন্ধ্যার কথা মনে থাকবে।

যাবার উপায়:

ঢাকা থেকে মৈনট ঘাটে আসার সবচেয়ে সুবিধাজনক উপায়টি হচ্ছে গুলিস্তানের গোলাপ শাহের মাজারের সামনে থেকে সরাসরি মৈনট ঘাটের উদ্দেশ্যে ছেড়ে আসা যমুনা পরিবহনে চেপে বসা। ৯০ টাকা ভাড়া আর দের থেকে আড়াই ঘন্টার বিনিময়ে আপনি পৌঁছে যাবেন মৈনট ঘাট। ফেরার সময় একই বাসে আবার ঢাকা চলে আসবেন। মৈনট থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে শেষ বাসটি ছেড়ে যায় সন্ধ্যা ৬ টায়।

গুলিস্তানের একই স্থান থেকে এন মল্লিক পরিবহনেও আসতে পারবেন। এক্ষেত্রে আপনাকে নামতে হবে নবাবগঞ্জের মাঝিরকান্দা নামক স্থানে। ভাড়া ৭০ টাকা। মাঝিরকান্দা থেকে লোকাল অটোতে দোহারের বাশতলা। ভাড়া ১৫ টাকা। চাইলে লক্ষীপ্রসাধ নামক স্থানে নেমে পোদ্দারবাড়ি নামক পুরনো বাড়িটিও দেখে নিতে পারেন। আর জজবাড়ি, উকিলবাড়ি, কোকিলপ্যারি দালান, খেলারাম দাতার বাড়ি যাকে স্থানীয়ভাবে আন্ধার কোঠা বলা হয়, এইসব দর্শনীয় স্থানগুলো ঘুরে দেখতে চাইলে মাঝিরকান্দার আগে কলাকোপা নামক স্থানেই নামতে হবে। যাইহোক, মাঝিরকান্দা থেকে বাশতলা আসার পর কার্তিকপুরগামী আরেক লোকাল অটোতে উঠতে হবে। ভাড়া ১৫ টাকা। কার্তিকপুর বাজার থেকে আরেক অটোতে মৈনট ঘাট। ভাড়া ১০ টাকা। রিক্সায় গেলে ২০ টাকা।

গুলিস্তানের ফুলবাড়িয়া থেকে নগর পরিবহনেও আসতে পারবেন। ভাড়া ৯০ টাকা। নগর পরিবহন নবাবগঞ্জের রুট ব্যবহার করে না। এই বাসটি আসে মুন্সিগঞ্জ হয়ে। এক্ষেত্রে আপনাকে কার্তিকপুর বাজারে নামতে হবে। ঢাকার বাবুবাজার ব্রীজ পার হয়ে কদমতলী থেকে সিনজিতেও আসতে পারবেন। লোকাল সিএনজি কদমতলী থেকে জনপ্রতি ১৮০ টাকা থেকে ২০০ টাকা ভাড়া নিয়ে কার্তিকপুর বাজার পর্যন্ত আসে। এছাড়াও যমুনা পরিবহন অথবা এন মল্লিক পরিবহন গুলিস্তানের যেই স্থান থেকে ছাড়ে, একই স্থান থেকে জয়পাড়া পরিবহন নামক মিনিবাসটিও ছেড়ে আসে দোহারের জয়পাড়ার উদ্দেশ্যে।

যারা প্রাইভেট কার অথবা বাইক নিয়ে আসতে চাচ্ছেন তারা এই বাসের রুটটাকে ব্যবহার করতে পারেন। আসতে সুবিধা হবে। এটি বাবুবাজার ব্রীজ পার হয়ে কদমতলী থেকে নবাবগঞ্জের রুট ধরে টিকরপুর-গালিমপুর হয়ে দোহারের প্রাণকেন্দ্র জয়পাড়া পর্যন্ত আসে। আগে এই বাসটি সরাসরি মৈনট ঘাট পর্যন্ত আসতো। কয়েক বছর ধরে জয়পাড়ার পরে আর আসছে না। লক্কর-ঝক্কর এই মিনিবাসে গুলিস্তান থেকে জয়পাড়া পর্যন্ত আসতে হলে ভাড়া দিতে হবে ৬০ থেকে আশি টাকা। দামাদামি করার সুব্যবস্থা আছে। জয়পাড়া থেকে কার্তিকপুর লোকাল অটো ভাড়া ২০ টাকা। ঢাকার মোহাম্মদপুর থেকেও আসার একটা পদ্ধতি আছে। মোহাম্মদপুর বেরিবাধের সিএনজি স্টেশন থেকে আটিবাজার, আটিবাজার থেকে সিএনজি অথবা একপ্রকার ছাদহীন টেম্পুতে কোনাখোলা। কোনাখোলা থেকে দোহার-নবাবগঞ্জগামী যেকোনো একটা বাসে উঠে পড়তে হবে। যারা গাবতলি অথবা সাভারের আশেপাশে থাকেন, তারা হেমায়েতপুর থেকে লোকাল সিএনজিতে সরাসরি নবাবগঞ্জ আসতে পারবেন। ভাড়া ১২০ টাকা। অথবা সরাসরি সিএনজি না পেলে হেমায়েতপুর থেকে হযরতপুর, হযরতপুর থেকে পারাগ্রাম, নৌকায় নদী পার হয়ে আরেক সিএনজিতে নবাবগঞ্জ সদর।

ঘন্টা ২ এখানে ঘুরে ব্যাটারি চালিত অটো নিয়ে চলে যাবেন বান্দুরা বাজার। সেখানে গিয়ে লাঞ্চ সেরে নিবেন। এরপর চাইলে খেতে পারেন সেখানের বিখ্যাত লরেঞ্জ বেকারীর চারা বিস্কুট। দূর্দান্ত স্বাদের এক অপূর্ব নির্মাণ, যে একবার খেয়েছে সে জীবনেও এই চারা বিস্কুটের নাম ভুলবে না। তারপর বাজারে একটু খুঁজলেই পেয়ে যাবেন বিখ্যাত রসগোল্লার দোকান “শান্তি মিস্টন্ন ভান্ডার”। স্বাদ করে নিতে পারেন দারুণ স্বাদের এই রসোগোল্লা।

খরচ:

স্পীডবোটে মৈনট ঘাট থেকে ফরিদপুরের চর ভদ্রাসন যেতে হলে ১৬০ টাকা করে গুনতে হবে জনপ্রতি। ১০ থেকে ১২ জন নিয়ে চলতে পারবে। স্পীডবোটে মৈনট ঘাট থেকে চর ভদ্রাসন যেতে সাধারণত সময় লাগে ১৬ থেকে ১৭ মিনিট। পদ্মায় ঢেউ থাকলে ২০ মিনিট। মৈনট ঘাটের একজন স্পীডবোট চালক মোহাম্মদ আকাশের ভাষ্যমতে ২০ মিনিটের জন্য স্পীডবোট রিজার্ভ করে পদ্মায় ভেসে বেড়াতে চাইলে গুনতে হবে ২০০০ টাকা। কয়েকজন মিলে শেয়ারে ভাড়া করলে ভালো হবে। আর দশ মিনিটের জন্য একহাজার টাকা। ট্রলার রিজার্ভ করে পদ্মায় ঘুরতে চাইলে ১ ঘন্টার জন্য ৫০০ থেকে ১০০০ টাকা গুনতে হবে। অবশ্যই দামাদামি করে নেবেন। ট্রলারের তথ্য পাওয়া গেছে ট্রলার চালক রুবেলের নিকট থেকে। নৌকা চালক শহিদুল ইসলামের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী ইঞ্জিনযুক্ত ছোট নৌকা নিয়ে ঘুরতে চাইলে ১ ঘন্টায় ৩০০ থেকে ৬০০ টাকা গুনতে হবে।

কোথায় খাবেন:

বেশিরভাগ মানুষেরই ইচ্ছা থাকে পদ্মার তীরে বসে পদ্মার সেই নামকরা ইলিশ খাওয়ার। মৈনট ঘাটে দু’টি ভাতের হোটেল আছে। একটি আতাহার চৌধুরীর হোটেল অপরটি জুলহাস ভূঁইয়ার হোটেল। আতাহার চৌধুরীর হোটেলে ইলিশ ৬০ থেকে ৯০ টাকা। বড় সাইজের ইলিশ খেতে চাইলে আগেই অর্ডার দিতে হবে। এছাড়াও বোয়াল ৮০ থেকে ১০০ টাকা, চিংড়ি ৬০ থেকে আশি টাকা। ভাত ১০ টাকা প্লেট। আর কার্তিকপুর বাজারে শিকদার ফাস্টফুড নামক একটা খাবারের দোকান আছে, ঢাকা হোটেল সহ আরও কিছু ভাতের হোটেলও আছে। আর একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা হলো, কার্তিকপুরের ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি খেতে ভুলবেন না। এখানকার মিষ্টি অনেকে বিদেশেও পাঠায়।

নিরাঞ্জন মিষ্টান্ন ভান্ডার, মুসলিম সুইটস, রনজিৎ মিষ্টান্ন ভান্ডার সহ আরও কিছু মিষ্টির দোকান আছে এখানে। ছানার রসগোল্লা ১৮০ টাকা থেকে ২০০ টাকা কেজি। সাধারণ রসগোল্লা ১৫০ টাকা কেজি। চমচম ও কালোজাম ১৬০ টাকা কেজি। বালুশা ১৪০ টাকা কেজি। জিলাপি ১০০ টাকা কেজি। রসমালাই ৩০০ টাকা কেজি। দধি ১৪০ টাকা কেজি।

সতর্কতা:

১) এখানে স্রোতের টান প্রচুর তাই সাঁতার না জানলে গোসল করার সময় বেশি পানিতে যাবেন না।
২) মনে রাখবেন এটা কোন সমদ্র সৈকত নয়, কিছু কিছু জায়গায় অনেক গভীর। পানিতে নামার আশেপাশের মানুষদের জিজ্ঞেস করে নিন।
৩) সিগারেট অথবা খাবারের প্যাকেট, পানির বোতল অথবা কোন প্রকার ময়লা যেখানে সেখানে ফেলে পরিবেশ নষ্ট করবেন না।
৪) দোকানি, নৌকাচালক সবার সাথে ভালো ব্যবহার করুন।
৫) ওখানে থাকার কোন ব্যবস্থা না থাকায় দিনে গিয়ে দিনেই ফিরে আসতে হবে

ঘুরতে গিয়ে যেখানে সেখানে ময়লা ফেলবেন না। মনে রাখবেন, আপনার একটু সচেতনতাই পারে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য দেশকে পরিচ্ছন্ন রাখতে।

আপনারা চাইলে গৃহত্যাগী’র ট্র্যাভেল গ্রুপের সাথে বাংলাদেশ আনাচে কানাচে ভ্রমণ দিতে পারেন।
গৃহত্যাগীর ফেসবুক গ্রুপঃ https://www.facebook.com/groups/Grihotagi/

(এছাড়াও কোন প্রশ্ন থাকলে কমেন্ট করতে পারেন)

Author
  • leave a comment

    Your email address will not be published. Required fields are marked *